ভ্রমণ

চন্দ্রনাথের চূড়ায়


  • স্মৃতি রানী বর্মণ  |
  • প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:৪৩
চন্দ্রনাথের চূড়ায়
ছবি: লেখক

পাহাড়ের প্রতি আকর্ষণের শুরু হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘যকের ধন’ আর বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’ বই পড়ার মধ্য দিয়ে। কী রোমাঞ্চকর সেই সব ভ্রমণকাহিনি! চাঁদের পাহাড়ের শঙ্কর আর যকের ধনের বিমল! কত স্বপ্ন দেখেছি তাদের মতো বড় বড় পাহাড় জয় করার। চাঁদের পাহাড় না হয় জয় করতে পারিনি। তবে সবকিছু পাশ কাটিয়ে চন্দ্রনাথের চূড়ায় যেতে পারা আমার জন্য এ বছরের সেরা একটি ঘটনা, যদিও এগারোশ ফুটের এই পাহাড়ে উঠতেই আমার জীবন যায়-যায় অবস্থা হয়েছিল!

গত এপ্রিল মাসের ১২ তারিখ রাতে ট্রেনে আমরা রওনা দিই চট্টগ্রামের উদ্দেশে। দ্বিতীয়বারের মতো চট্টগ্রামে যাচ্ছি, তার ওপর ঘুরতে, বন্ধুবান্ধব সাঙ্গপাঙ্গসহ। ট্রেনে আমি একফোঁটা ঘুমাতে পারিনি। ভোরবেলার দিকে ফেনী পার হতেই ছোট ছোট পাহাড়, সবুজ পরিবেশ আর গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে ভোরের সূর্যের আরাম-আরাম আলো দেখতে পাচ্ছি। অসাধারণ লাগছিল সবকিছু, সারা রাতের ক্লান্তি নিমেষে শেষ হয়ে গেল ভোরের আলো দেখে। সেই সঙ্গে মনে হচ্ছিল, কত বছর পর সূর্যোদয় দেখলাম!

চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমে সেখান থেকে বাসে করে যাই সীতাকুণ্ড বাজার। সেখান থেকে অটোরিকশায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে। সেখানে আছে শঙ্কর মঠ। এর আশপাশে কয়েকটি লাঠির দোকান আছে। পাহাড় চড়তে লাগে। আমরা চারজন চারটা লাঠি কিনলাম। হাতে লাঠি নেওয়ার পর সত্যিকার পাহাড়জয়ী একটা মনোভাব চলে এল। শুরু হলো আমাদের ট্রেকিং! উদ্দেশ্য চন্দ্রনাথের চূড়া।

আমাদের সঙ্গে রওনা দেওয়া ছোটবড় আরও কিছু ট্রেকিং দল ছিল। তাদের মধ্যে একটা দলের কাছে ছিল সাউন্ড বক্স। তারা গান শুনে শুনে পাহাড়ে উঠছিল। বেশ মজা করছিল দলটা। ট্রেকিংয়ে কষ্ট কমানোর এই তরিকা পছন্দ হয়েছে আমার। পাহাড়ের একটু ওপরে উঠতেই কেমন একটা ঝিঁঝিঁ-ঝিঁঝিঁ ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। চারপাশ নিস্তব্ধ। তার মধ্যে অদ্ভুত এই শব্দ। ভিন্ন একটা অনুভূতি হচ্ছিল। পথের মাঝে দেখা পেলাম বানর দলের। তারা আমাদের কাছে এল একটু আদর নেওয়ার জন্য। কিন্তু বেচারাদের আদর থেকে বঞ্চিত করল ওখানকার কিছু মানুষ। তারা বলছিল, বানর নাকি মুঠোফোন, ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দেয়! তাই কাছে গিয়ে তাদের আর আদর দেওয়া হলো না।

পাহাড়ের ওপরে ছোট ছোট টং দোকান। সেগুলোতে বেশি বিক্রি হচ্ছিল ঠান্ডা শরবত। রোদ আর গরমে আমরা সবাই এত ক্লান্ত ছিলাম যে, বারবার এই টং, ওই টংয়ে একটু করে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এক টংয়ে বসে দোকানদার মামার সঙ্গে আড্ডা জমালাম চারজন মিলে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা। চন্দ্রনাথের নিচেই বাড়ি। তিনি প্রতিদিন সকালে এই পাহাড়ে ওঠেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকান চালান। মাঝেমধ্যে প্রয়োজনে একাধিকবার ওঠানামা করতে হয় পাহাড়ে। আমরা যেখানে একবারেই হাঁপিয়ে যাচ্ছি, সেখানে কয়েকবার এই পাহাড়ে ওঠানামা করা! অভ্যাস আছে বলেই সম্ভব!

দোকানদার মামার সঙ্গে অনেক সময় ধরে আড্ডা দিলাম, পাহাড়ি জীবনযাপন নিয়ে কথা বললাম। শুনলাম তার ছোটবেলা থেকে পাহাড়ে বেড়ে ওঠার গল্প। তিনি খুব মজার একটা ঝালমুড়ি খাওয়ালেন, পাহাড়ি কলা আর আম খাওয়ালেন। আসার সময় তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য নেমন্তন্নও করলেন।

আমরা যখন চন্দ্রনাথের চূড়ায় পৌঁছাই, তখন ঠিক দুপুরবেলা। ঠা ঠা রোদ্দুর। গরম আর পাহাড়ি হাওয়া। সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ এক মুহূর্তে আমার পাহাড়জয়ের স্বপ্ন পূরণ হলো অবশেষে! চন্দ্রনাথ 

আমরা চন্দ্রনাথের চূড়া থেকে নামলাম অন্য পথে। এবারের উদ্দেশ্য পাতাল কালীবাড়ি। বিশাল বিশাল কালো পাথরে আচ্ছাদিত একটা জায়গা। অনেক দূর পথ ট্রেকিং করে আমরা পাতাল কালীবাড়িতে পৌঁছাই। পুরো জায়গাটা লাল কাপড়, লাল ফিতা দিয়ে সাজানো। কালো কালো পাথরের ভেতর থেকে ছোট ছোট ঝরনা দিয়ে অনবরত জল বের হচ্ছে। আমরা ঝরনার জলে পা ভেজাই। কী অসম্ভব ঠান্ডা জল। ওখানে কয়েকজন সাধু-সন্ন্যাসীর বসবাস দেখতে পাই। তাদের জীবনটা কতই না আলাদা! ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’ বলতে যে জীবন, সম্পূর্ণ সেই জীবন তারা কাটাচ্ছেন। পৃথিবীর এত আয়োজনে কি তাদের কিছু যায়-আসে! তারা তো দিব্যি কাটাচ্ছেন তাদের দিন। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, পৃথিবীর সকল আয়োজন পেছনে ফেলে।

পাতাল কালীবাড়ি থেকে আমাদের তৃতীয় গন্তব্য ছিল বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত। এটি ছিল আমার প্রথম সমুদ্রদর্শন। যখন বাঁশবাড়িয়ায় গিয়ে পৌঁছাই, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। প্রথমবার সমুদ্রের গর্জন শোনা, সমুদ্রের সফেদ পানিতে পা ভেজানো, দুই হাত উড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে পাখির মতো ছবি তোলা! আহা, কী অসাধারণ অনুভূতি!

চারজন বসলাম সমুদ্রের ধারে। সারা দিনের ক্লান্ত দেহ। সঙ্গে ছিল বাদাম, ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া বাখরখানি। আর নেওয়া হলো চার কাপ চা। সমুদ্রের ধারে বসে চা খেয়েছেন কি কখনো? এটা হাইলি রেকমেন্ডেড!

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো। আমাদের গল্প জমে উঠেছে। সমুদ্রের গর্জন বাড়ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম আমরা। তারায় তারায় জ্বলজ্বল করছে আকাশ। কই! ঢাকায় তো এত তারা দেখা যায় না? আজ কি তারাদের দেশে বিশেষ কোনো উৎসব আছে? এত জ্বলজ্বল করছে যে! কী জানি! হয়তো তারাদের মেলা দেখার জন্যই আমাদের এতবার বাতিল হওয়া সীতাকুণ্ড ভ্রমণটা আজ সফল হলো।


ক্যাটাগরি: ভ্রমণ

         

  রেটিং: ৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।